স্কুল ড্রেস

স্কুল ড্রেস


এই রিক্সা যাবা
রহমত মিয়া নিরাসক্ত দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, কই যাইবেন?
চৌরাস্তা।
না ওদিকে যামু না।
রহমত মিয়া ধীরে ধীরে রিক্সার প্যাডল দিতে থাকে।আজকে তার রোজগার ভাল। এখন হোটেলে গিয়ে চারটা ডাল-ভাত খেতে হবে।আজকে মুরগি দিয়া খাওয়া যায়। চিন্তাটা মাথায় আসলেও সাথে সাথে গাঁয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটার কথা ভেবে  সে কিছুটা  আনমনে হয়ে রিক্সা চালাতে থাকে।মেয়েটা এ বছর স্কুলে ভর্তি হয়েছে। একটা নতুন স্কুল ড্রেসের জন্য আজকেও মোবাইলে কান্না-কাটি করছে। এখন আয়রোজগার যখন একটু ভাল হচ্ছে তা দিয়া বাজে খরচ না করে কিছু টাকা জমিয়ে মেয়েটাকে একটা ড্রেস কিনে দিলে খুশি হবে।ছেলেটাকে তো কিছুই দিতে পারে নাই।আর দিবেই বা কোথা দিয়ে।গাঁয়ে বদলা দিয়ে যা আয় হত তা দিয়া তিনবেলা খাওয়াই  জুটত না।বউটা ঠিকা কাজ করে সংসারটা কোনরকম দুইজনে চালিয়েছে।মেয়েটা হওয়ার পর ছোটশালার কথামত শহরে এসে রিক্সা চালিয়ে বাড়ি টিনের ঘর উঠছে,পোলারে মেট্রিক পাস দেওয়াইছে।হানিফ মাস্টার  বলছে পোলায় নাকি খুবই ভাল পাস দিছে।
রহমতকে দেখে কালু মিয়া বলে উঠল, কি মিয়া আইজ তাড়াতাড়ি আইলা যে।
খ্যাপ নাই, মানু এহন ব্যাটারির গাড়ি খোজে, আমাগো রিক্সায় উঠতে চায় না।
হ মিয়া হেইডা ঠিক কইছো। এহন কি হেই দিনকাল আছে যে রিক্সায় উঠবো। সবাই টাহা বাঁচায়। আরে ব্যাডা টাহা দিয়া কি হইব,মান-ইজ্জতের একটা ব্যপার আছে না। আমি তো মিয়া রিক্সা ছাড়া চলিই না। পায়ে হাটমু মাগার গা ঘেসাঘেসি কইরা অটোতে চরমু না।
কালু মিয়ার ভাতের হোটেলে  দুপুরবেলা ভীড় একটু কম থাকে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ভিড় বাড়তে থাকে। রহমতের মত খেটে-খাওয়া মানুষেরাই তার কাস্টমার । তাই সবজিনিসের দাম যেমন কম,তেম্নি খাবার মানটাও বেশিরকম ভাল। চারপাশে খুঁটি কুপে ভাঙ্গা টিন দিয়া বেড়া দেয়া। জানালা বলতে কিছু নাই,চটের বস্তা কেটে তা ঝুলিয়ে রাখা। উপরে গোটাকয়েক টিন দেয়া,আর তার নিচে চাটাই। গোটাচারেক সস্তাকাঠের টেবিলের সাথে কাঠের বেঞ্চ পাতা।পাশেই একটা নর্দমা, এলাকার বাসিন্দারা সেটাকে ডাস্টবিন হিসেবে ব্যাবহার করে। এই কালু মিয়ার ভাতের হোটেল। টেবিল যে ন্যাকড়াটা দিয়া মুছে তা যে কবে ধোয়া হইছে তা নিয়া ভাবার সময় এখানকার কারোরই নাই। কোন সাইনবোর্ড নেই। দুজন লোক এখানে খাবার দেয়ার কাজ করে। তারা রাতে হোটেলেই ঘুমায়।  রহমত ডিম দিয়া খুব আরাম করে ভাত খেল।

রহমত  বিল দিয়া একটা শেখ সিগারেট ধরিয়ে রিক্সার উপর বসে আয়েশ করে টানতে লাগল। এই সময়টা তার অন্তত প্রিয়। সুযোগ পেলেই সে ছায়াঘেরা নির্জন কোন জায়গায় রিক্সা থামিয়ে সিটের উপর পা তুলে স্বপ্নের জাল বনে। এখন ভর দুপুর, খ্যাপ না পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কত ইচ্ছা ছিল আয় ভাল হলে টাকা জমিয়ে গাঁয়ের বন্ধকী জমি ছাড়িয়ে নেবে। তারপর গাঁয়ে গিয়া নিজের জমি নিজে চাষ করবে।কিছু টাকা সে রাখছিল,কিন্তু আর বছর মায়ের এমন অসুখ হল যে শহরে এনে হাসপাতালে ভর্তি করতে হল।ডাকতর ব্যাটা কয়দিন টেস-ফেস করল। কিছুই হল না,মায়েও মরল আর টাকা গুলাও সব গেল। মানুষ চাইলে ই সব হয় না,সব ই তার ইচ্ছা।
সিগারেটের শেষটানের সাথে সাথে তার মেয়ের স্কুল ড্রেসের কথা মনে পরে গেল। তাই আয়েশ করার চিন্তা বাদ দিয়ে সে আস্তে আস্তে রিক্সায় প্যাডল দেয়া শুরু করল।এই দুপুরবেলা কলেজগুলোর সামনে কিছু যাত্রী পাওয়া যায়। এদের কোন গন্ত্যব্যস্থল নেই। কতক্ষণ রিক্সায় ঘুরাঘুরি করে নেমে যায়। বেশিরভাগ যাত্রীই রিক্সা আস্তে আস্তে চালাতে বলে। শহরের যত নিরিবিলি গলি আছে তাতে ঢুকতে বলে, ঘণ্টাখানেক ঘোরার পরে নেমে  জানতে চায় মামা কত দিমু ? যা চায় তাই দিয়া দুজনে চলে যায়।
আজকেও তেমন একজোড়া যাত্রী পেয়ে গেলে খারাপ হতো না। ভরাপেটে জোরে গাড়ি চালাতে ইচ্ছা লাগে না।দুইজনকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে আস্তে আস্তে তাদের সামনে গিয়া জিজ্ঞেস করল, যাবেন?
ছেলেটা ইতস্তত করে জবাব দিল, হ্যা।
উঠেন মামা। হুড উঠাইয়া দেই?  
দেন।আস্তে আস্তে চালাবেন। ছেলেটির মুখে লাজুক স্বর। 
এদের কখনো জিজ্ঞাসা করতে হয় না কই যাবেন এটা রহমত ভালই জানে। তবে এই দুইজন নতুন। রিক্সা নিয়ে ঘুরব, ভাড়া দিব। এতে যে লজ্জার কিছু নাই সেটা বুঝতে পারতেছে না।রিক্সা নিয়া এমন গলিতে ঢুকল যেখানে সচারচার রিক্সা ঢোকে না। এরা তার রিক্সায় যত বেশি সময় থাকবে তার ইনকাম  তত বেশি। তাহলে মেয়ের ইস্কুল ড্রেস হয়ত দুই-একদিনের মধ্যেই কিনে  বাড়ি যেতে পারবে। দুই হপ্তা হল সে বাড়ি যায় না। বাড়ির জন্য মনটা কেমন জানি করছে। আজকে একটু বেশি রাইত পর্যন্ত রিক্সা চালাইলেই হাজারখানেক টাকা ইনকাম হবে ইনশাল্লাহ। কালকেও যদি এমন ইনকাম হয় তাহলে পরশুর লঞ্চে উঠবে।
অই মামা দেখে চালাতে পার না।
যাত্রীর কথায় হুঁশ হল,খানাখন্দের উপর রিক্সা ঝাঁকুনি খেয়েছে। বাড়ি যাবার চিন্তায় জোরে প্যাডল দেয়া শুরু করছিলো। আবার আস্তে আস্তে চালাতে লাগলো।
বিগত কয়দিনে যা ইনকাম হইছে এমন আয় রহমতের কখনো হয় নাই। এই তিনদিন রিক্সা নিয়া যেখানে গেছে প্যাসেঞ্জার পাইছে।মেয়ের স্কুল ড্রেস বানিয়ে দেবার পরও হাতে কিছু টাকা থাকবে।খুবই আনন্দিত মনে সে আজকে রিক্সা নিয়ে বের হয়েছে।আল্লাহর রহমতে কালকের সকালের লঞ্চেই উঠবে। বাড়ির কাউকে সে বলেনি সে কালকে আসতেছে। সবাইকে অবাক করে দেবে। শুধু বিন্তির মায়ের কাছ থেকে জেনে মেয়ের স্কুল ড্রেসের আকাশি-কমলা রঙের  কাপড়  কিনেছে। গাঁয়ে কাপড়ের দাম অনেক বেশি নেয়।ছেলেমেয়ের মাকে শুধু বলেছে সে আসতেছে।এইবার সে বাড়িতে গিয়া কয়েকদিন থাকবে।  


তেমাথার মোড়ে মানুষের ভিড় জমে আছে।ঘণ্টায় আশি কিলোমিটার গতিতে আসা পিকআপের ধাক্কায় একটা রিক্সা রাস্তার পাশে পরে আছে। রিক্সার যাত্রীর আঘাত তেমন গুরতর না।সে ছিটকে নর্দমায় পড়েছে।কিন্তু রিক্সাওয়ালার দেহটা নিথর পরে আছে।চারিদিকে রক্তে ভেসে যাচ্ছে।গাড়ির পিছনের চাকায় মাথাটা থেতলে গেছে।মুখ চেনা যাচ্ছে না। তার পাশে একটা শপিং ব্যাগে আকাশি-কমলা রঙের কাপড়ের অংশ বের হয়ে আছে। কাপড়ের গায়ে ছোপ ছোপ রক্ত মাখা।





Comments

Popular posts from this blog

কাতার বিশ্বকাপ ২০২২, সমকামিতা এবং আমার মৃত ভাই

বুক রিভিউ- ১ : তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রনে - হুমায়ূন আহমেদ