অনাঘ্রা্তা


প্রত্যেকরাতে কোথা থেকে যেন প্রেশারকুকারে রান্নার শব্দ আসে। তনু পড়ার টেবিল ছেড়ে বারান্দায় এসে শোনার চেষ্টা করছে কোন বাসা থেকে প্রতিদিন এই শব্দটা আসছে। সে কয়েকদিন ধরেই এই রহস্যটা সমাধান করার চেষ্টা করছে। প্রতিরাতে কেউ তিন-চারবার প্রেসারকুকারে রান্না করবে সেটা ভাবতেই অবাক লাগে।শব্দটা কোথা থেকে আসছে,দোতলার ব্যালকনি থেকে বোঝা যাচ্ছে না । সামনে এইচ.এস.সি পরীক্ষা।এখন উচিত সময় নষ্ট না করে পড়ার টেবিলে বসা।যদিও সব পড়া।তবু পরীক্ষার আগে পড়ার টেবিল রেখে এইরকম ফালতু বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতে নিজের উপরই বিরক্ত লাগছে। মা এসে বারান্দায় দেখলেই চোখমুখ অন্ধকার করে বলবে, দু’দিন পর তোর পরীক্ষা, আর তুই এখন বারান্দায় বসে বাতাস খাচ্ছিস। জীবনে যদি তোর কান্ডজ্ঞান হত। যদিও তনুর মনে হয় ওর কান্ডজ্ঞান খুব ভালই আছে । সে বোর্ড স্ট্যান্ড করা ছাত্রী । এস.এস.সি তে সারা বাংলাদেশে ফিফথ হয়েছে। তার চোখের চশমার পাওয়ার দিন দিন বাড়াতে হচ্ছে। পড়ার টেবিলে বসার সাথে সাথে ও বাবার গলার আওয়াজ পেল।
তনু মা, কি করছ? বলতে বলতে আহাদুল করিম রুমে ঢুকলেন ।
মুচকি হেসে তনু মুখ তুলে চাইলেন। আহাদুল করিম একটা ধাক্কার মত খেলেন। তনু যতবার মুচকি হেসে মুখ তুলে তাকায় তার বুকের মধ্যে হাহাকার করে উঠে ।তার বড় মেয়েটি এত সুন্দর কেন! সুন্দরী মেয়েদের জীবনে ঝামেলার অভাব হয় না ।
মা, পরাশুনা কেমন চলছে?
ভাল।
সন্ধায় নাস্তা করেছ?
হ্যা।
তোমার মা কোথায়?
জানি না।
বিকেলে বাসা থেকে বের হয়েছিলে?
না।
বিকালবেলা ছাদ থেকে ঘুরে আসবে। মনের রিফ্রেশমেন্টের দরকার আছে ।
আচ্ছা কালকে থেকে যাব।
ঠিক আছে। আমি যাই একটু ফ্রেশ হয়ে নি ।
প্রতিদিন বাবার  গৎবাঁধা এইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে তনুর খুব ই ভাল লাগে ।তনুর মনে হয় বাবা নিজেও জানেন না সে একই প্রশ্ন তার মেয়েকে বারবার করে আসছেন । জানলে করতেন না ।


সিড়ি দিয়ে নামার সময় তনুর সাথে সবুরের দেখা।তনুকে লেডি আইনস্টাইন বললে খুব খেপে যায়। জ্ঞানী  জ্ঞানী একটা চেহারা।তবে সবসময় মুখে লেগে থাকা মিষ্টি হাসিটা কাটখোট্টা টাইপ বিজ্ঞানীদের সাথে যায় না।খুব সাদামাটা চলাফেরা।হালকা সবুজের উপর সাদা ছাপ মারা একটা সালোয়ার পরেছে। ড্রেসটায় ওকে চমৎকার লাগছে। অন্য কাউকে এই ড্রেসটায় মানাত না।  
কোথায় যাচ্ছেন সবুর ভাই?
ইলেক্ট্রিশিয়ান খুঁজতে । আমাদের এসিতে যেন কি যেন গোলমাল হয়েছে। প্রায়ই শিষ বাজানোর শব্দ হয়। 
ও আচ্ছা। যাক বাবা, প্রেসারকুকার ঘটনা থেকে মুক্তি পাওয়া গেল।
মানে?
আমি কয়েকদিন ধরেই টের পাচ্ছি কারা যেন প্রতিদিন রাতে তিনচারবার প্রেসারকুকারে রান্না করছে। রহস্যটা এবার পরিষ্কার হল।
সবুর গলা ফাটিয়ে হেসে উঠল । তনুর মনে হচ্ছে ফ্লাটের সবাই এখনই বের হয়ে আসবে। সে এমন হাসির কি বলল যে মানুষটা এত জোড়ে হেসে উঠল ।
সবুর হাসতে হাসতেই বলল, সাধে কি তোমাকে আমি লেডি আইনস্টাইন বলি।সামান্য শব্দ নিয়ে এত গবেষণা! তুমি মাঝে মাঝে খুব মজার কথা বল।
কেন আমি বুঝি মজা করতে পারি না।
আমার তো মনে হয় বইয়ের টেবিলে মাথাগুজে পরে থাকা ছেলে-মেয়েগুলো অঙ্কমাস্টারদের মত কাটখোট্টা টাইপের হয়।বলেই আবার অট্টহাসি দিয়ে উঠল ।
আপনি তো সবজান্তা সমসের। বলেই তনু হিলের টকাস টকাস শব্দ তুলে উপরে উঠে গেল। সবুর হাসি মুখে অর যাওয়ার পথের দিকে রইল।এখন ওর সময় হাতে নেই।নাহলে আরো কিছুক্ষণ খেপানো যেত। ইলেক্ট্রিশিয়ান খুঁজে এনে দিয়ে ওকে আবার টিউশনি বাসায় যেতে হবে । যদিও জানে মিস্ত্রি খুঁজে এনে কোন লাভ নেই । মেকানিক আসলে বাবা এসি দেখিয়ে  কিছুক্ষণ গল্প করবেন। তারপর এককাপ চা খাইয়ে তাকে বিদায় করে দেবেন।যাদের তিনবেলা বাজার ঠিকমত  চলে না তাদের বাসায় এসির মত বিলাসিতা শোভা পায় না। জোটে না পান্তা আবার কোরমা পোলাও। তবু এই কোরমা পোলাও ওদের কপালে জুটেছে  ফুফুর সৌজন্যে। ওর ফুফা আলী আকবর সাহেব সামান্য সরকারী চাকুরী করে বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক হয়ে গেছেন।ফুফা কখনও ওদের বাসায় আসেন না।কিন্তু ফুফু প্রতিমাসে একবার এসে ভাইয়ের দৈন্যের কথা মনে করিয়ে দেয়াটা নিজের দায়িত্ব বলে মনে করেন।এসি ছাড়া সে আবার কোথাও বসতে পারে না।তাই তদের পুরনো এসিটার ঠাই হয়েছে ওদের গরিবখানায়।গরিবের পেটে কোরমা পোলাও পরলে একটু বদহজম হয়। ঝামেলা শেষ।কিন্তু বড়লোকের হাতি পালা যে কি সেটা ওরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে । প্রতিমাসে কারেন্ট বিলের কাগজ দেখলে মাথা ঘুরে যায়।

(চলবে)  

Comments

Popular posts from this blog

কাতার বিশ্বকাপ ২০২২, সমকামিতা এবং আমার মৃত ভাই

বুক রিভিউ- ১ : তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রনে - হুমায়ূন আহমেদ